প্রবাসি_মামার_বউ
পর্ব (৮)
সকালটা শুরু হলো একটা অদ্ভুত অনুভূতি নিয়ে। আগের রাতের নীরবতাটা এখনো মনের কোণে রয়ে গেছে। একঘেয়েমি নয়, বরং একটা অজানা রোমাঞ্চ। বারান্দায় দাঁড়িয়ে চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে আমি ভাবছিলাম—এই যে অনুভব, এই যে অনিশ্চিত সম্পর্কের টানাপোড়েন, এর শেষ কোথায়?
নিচে চোখ পড়তেই দেখি, মামী উঠোনে গাছগুলোতে পানি দিচ্ছে। সূর্যের আলো তার মুখে পড়েছে, আর আমি তাকিয়ে আছি অপলক। শাড়ির আঁচলটা কপালে টানা, কিন্তু চোখে স্পষ্ট ঘুমের অভাব। মন বলছে—মামী হয়তো গতরাতেও ভালো ঘুমায়নি।
আমি: মামি... আজ কোথাও বের হবো?
মামী (হালকা হাসিতে): না রে, আজ একটু বিশ্রাম দরকার। তোকে নিয়ে প্রতিদিন ঘুরে বেড়াতে গিয়ে আমিই ক্লান্ত হয়ে গেছি।
আমি চুপচাপ তাকিয়ে রইলাম। এমন একটা মামী, যাকে ঘরের মানুষ বোঝে না, আর বাইরের সমাজ শুধু দোষ খোঁজে—সে কেমন করে এতটা হাসিমুখে নিজেকে ধরে রাখে?
আমি ভেতরে চলে এলাম। কিন্তু মনে হচ্ছিল, কোথাও একটা শূন্যতা জমে আছে।
---
বিকেল।
মামী আজ সারাদিন রান্নাঘরেই ব্যস্ত ছিল। মাঝে মাঝে তার সিঁথির সিঁদুর চোখে পড়ে যাচ্ছিল। আজ দুপুরে আমাদের নানাবাড়ির এক দূর সম্পর্কের আত্মীয় আসবেন শুনে একটু বাড়তি রান্না।
চুপচাপ বসে মামী কাজ করছিলেন, এমন সময় আমি পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।
আমি: মামি, আজ এত আয়োজন? কেউ আসছে?
মামী: হ্যাঁ, তোর মামার ছোটখালা আসবে। অনেকে আসে মাঝে মাঝে খোঁজ নিতে, কেউ শুভকামনায়, কেউ কেবল মুখ দেখে চলে যেতে।
আমি: তুমি সবার মুখ দেখো, হাসো—কিন্তু নিজের জন্য হাসো কবে?
মামী থমকে গেলেন। হাতের চামচটা থামিয়ে আমার দিকে তাকালেন, চোখে জল চিকচিক করছিল।
মামী: তুই এসব কোথা থেকে শিখলি আরিয়ান? বয়স তো তোর বেশি না, কিন্তু মনের গভীরতা…
আমি: মনের গভীরতা বয়স দেখে আসে না। কারো চোখে যদি অপ্রকাশিত কষ্ট দেখতে পাও, তাহলে হৃদয় নিজেই গভীর হয়ে যায়।
আমরা দুজন কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। বাইরে থেকে পাখির ডাক আসছিল, ঘরের ভেতর তাপমাত্রা বাড়ছিল, কিন্তু আমাদের মাঝে যেন একটা স্নিগ্ধ শীতলতা নেমে এসেছিল।
---
সন্ধ্যা।
মামার ছোটখালা এসে গেলেন। মামী যথারীতি সেজেগুজে দরজা খুললেন, অভ্যর্থনা করলেন, নাস্তা এগিয়ে দিলেন। আমি দূর থেকে তাকিয়ে ছিলাম। কেউ জানে না, সেই হাসিমাখা মুখের ভেতরে কতটা অভিমান, একাকিত্ব আর না-বলা কান্না জমে আছে।
ছোটখালা মামীকে উদ্দেশ্য করে বললেন—
ছোটখালা: তুই তো এখন বেশ স্বাধীন দেখছি! শুনি, বাইরেও যাস অনেক?
মামী (নরম গলায়): না খালা, তেমন কিছু না। ভাতিজা এসেছে, ওকে একটু এখানে-ওখানে নিয়ে যাই মাঝে মাঝে।
ছোটখালা (ঠোঁট বাঁকিয়ে): হ্যাঁ হ্যাঁ, আমরাও বুঝি। তবে খেয়াল রাখিস, মেয়েদের মান-ইজ্জতের কথা সবার আগে ভাবতে হয়। বুঝলি?
আমি রাগ সামলাতে পারছিলাম না। কী অধিকার নিয়ে কেউ একজন অন্যের স্বাধীনতা নিয়ে এত মন্তব্য করে?
মামী শুধু মাথা নিচু করে হাসলেন। একটা আত্মসম্মানহীন, লজ্জামাখা হাসি।
---
রাত ৯টা।
ছোটখালা চলে গেছেন। মামী ছাদে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন, আমি জানালার পাশে বসে তাকে দেখছিলাম। চাঁদের আলো পড়ে তার গালে। বাতাসে শাড়ির আঁচল উড়ছে। আমি আর থাকতে পারলাম না, ছাদে চলে গেলাম।
আমি: মামি, তুমি সব কিছু এত চুপচাপ মেনে নাও কেন?
মামী (চোখ সরিয়ে): সব কিছুর প্রতিবাদ করা যায় না আরিয়ান। সমাজের শেকলগুলো অনেক শক্ত, একা একজন মেয়ে যতই গলা ফাটাক, কেউ শুনবে না। বরং আঙুল তুলবে আরও।
আমি: কিন্তু কেউ যদি পাশে দাঁড়ায়? যদি কেউ তোমার হয়ে কিছু বলতে চায়?
মামী হালকা হেসে বললো: তুই তো আমার ভাতিজা...
আমি চুপ করে গেলাম। আমরা দুজন ছাদের একপাশে এসে দাঁড়ালাম। নিচে গ্রামের পিচঢালা রাস্তা, দুরে একটা মোটরসাইকেলের শব্দ, আর মাথার ওপরে বিশাল নীরব আকাশ।
এক সময় মামী বললো—
মামী: আরিয়ান, তুই কি জানিস, আমি শেষ কবে নিজেকে মানুষ বলে অনুভব করেছি?
আমি ধীরে মাথা নাড়ালাম।
মামী: মনে পড়ে না। এই চার দেয়ালের ভেতর নিজেকে শুধু দায়িত্বের মূর্তি মনে হয়। কেউ বলে বউ, কেউ বলে বউমা, কেউ বলে মামী। কিন্তু কেউ কি কখনও জিজ্ঞেস করেছে আমি কেমন আছি?
আমি চোখ নামিয়ে বললাম—
আমি: আমি জিজ্ঞেস করছি... তুমি কেমন আছো?
মামী চমকে তাকালেন আমার দিকে। চোখ দুটো যেন ভিজে উঠলো।
মামী: কেমন আছি জানিস? ঠিক খাঁচার ভিতরের পাখির মতো, যে উড়তে জানে, কিন্তু জানালাটা খোলাই হয় না। শুধু দিন গোনে কবে খাঁচাটা খুলে দেবে কেউ।
আমার বুকটা ধক করে উঠলো।
আমি: যদি আমি সেই জানালাটা খুলে দেই? যদি বলি, উড়তে শেখো আবার?
মামী হেসে ফেললেন। অদ্ভুত এক হাসি। তাতে ছিল কষ্ট, ছিল আশা, আবার ছিল একরাশ ভয়।
মামী: উড়তে চাইলে আগে নিজের ডানা ফিরে পেতে হয় আরিয়ান। আমার ডানাগুলো বহু আগেই কেটে ফেলেছে সমাজ। শুধু বোঝা দিয়েই দিয়েছে।
আমি তার পাশে দাঁড়িয়ে বললাম—
আমি: আমি সেই বোঝাগুলো হালকা করতে চাই। আমি চাই, তুমি আবার হাসো—নিজের জন্য হাসো।
মামী চুপ করে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন—
মামী: একদিন হয়তো এইসব কথা কোনো গল্প হবে। যেখানে একজন প্রবাসী স্বামীর স্ত্রীর একাকীত্ব, নিঃসঙ্গতা আর একটুখানি সাহস থাকবে। আর সেখানে থাকবে এক তরুণ, যে শুধু বুঝতে চায় একজন নারীর না বলা কথা।
আমার গলা শুকিয়ে গেলো। বললাম—
আমি: যদি সেই গল্পে আমি থাকি... তাহলে তোমার চরিত্রটার নাম কী রাখবে?
মামী হেসে বললো—
মামী: “অভিমানের চাদরে মোড়া এক মানবী।”
আমরা দুজন একসাথে আকাশের দিকে তাকালাম। অনেকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকার পর মামী বললেন—
মামী: আরিয়ান... যদি বলি, কখনো কখনো আমার ইচ্ছে করে, কেউ আমাকে শুধু বলুক—"তুমি একা নও", তাহলে কী বলবি?
আমি বললাম—
আমি: বলবো... “তুমি একা নও মামী, আমি আছি।”
চুপচাপ একটানা বাতাস বইছে। দূরের গাছগুলো দুলছে। মনে হচ্ছিল, চারপাশের প্রকৃতি যেন আমাদের অনুভব শুনছে।
---
রাত ১১টা।
ঘরে ফিরে এসে দেখি, নানু আবার বসে আছেন মন খারাপ করে। আমি কিছু বলার আগেই তিনি বললেন—
নানু: তোর মামী আবার সারাদিন বাইরে ছিলো?
আমি কিছু না বলে চুপ করে রইলাম। মামী এসে পাশে দাঁড়ালেন।
মামী (নরম গলায়): আম্মা, বাইরে গেলেই কি আমি খারাপ হয়ে যাই? আমি কি খারাপ কিছু করি?
নানু (রাগে): সমাজ যা দেখে তাই বলে। তুই বুঝিস না! মানুষ কী বলবে?
মামী (চোখে জল): মানুষ কী বলে তাতে কি আমার কষ্ট কমে যাবে? আমিও তো মানুষ, আমিও তো ভালোবাসা চাই।
নানু চুপ করে গেলেন। পুরো ঘরটা এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় ছেয়ে গেল।
---
রাত সাড়ে এগারোটা।
আমি আবার বারান্দায় দাঁড়িয়ে। পাশে এসে দাঁড়ালেন মামী। আমরা দুজন চুপচাপ, আকাশের চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছি।
আমি: মামী... আজ তুমি ক্লান্ত?
মামী: না আরিয়ান, আজ একটু হালকা লাগছে।
আমি: তুমি জানো? আজ তুমি অনেক সুন্দর লাগছো।
মামী হেসে বললেন—
মামী: তুই না! আবার শুরু করলি...
আমি ধীরে বললাম—
আমি: মামী... যদি অনুভবটাই যথেষ্ট হয়, তাহলে সম্পর্কের নামের এত দরকার কী?
মামী চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন—
মামী: তোর চোখে আমি নিজের একটা প্রতিবিম্ব দেখতে পাই আরিয়ান। একটা শান্তি, যেটা কেউ কখনো দেয়নি।
আমি বুঝে গিয়েছিলাম—এই অনুভব, এই চুপ করে পাশে দাঁড়ানো, এই না বলা কথাগুলো... এগুলোই তো সবচেয়ে গভীর ভালোবাসা।
কোনো নাম নেই আমাদের মাঝখানে। তবুও—এই সময়টুকু, এই অনুভবটুকু হয়তো সারাজীবন থেকে যাবে।
---
চলবে...
এই গল্পটা এই পেজে সবার আগে পাবেন কারন এই গল্প টা বর্তমানে পুরো ফেসবুকের ভিতর এই পেজ থেকে সবার আগে পাবেন! পরবর্তী অংশ সবার আগে পড়তে পেইজে ফলো করুন
0 Comments